পাঁচ বছর আগের এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী বোধিপ্রিয় চাকমা একটি পা হারান। স্বামীর আয়ে অক্ষম হয়ে পড়ার পর সংসারের সম্পূর্ণ ভার কাঁধে পড়ে স্ত্রী শান্তনা চাকমার। দুই কন্যাকে নিয়ে রাঙামাটি শহরের আমানতবাগ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে পুরো সংসারের ঘানি একাই টানছিলেন তিনি।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে দূর পাহাড়ি পথে ছুটতেন কাঁচাবাজারের সন্ধানে। সেখান থেকে শাক সবজি সংগ্রহ করে রাঙামাটির কল্যাণপুর ও বনরূপা বাজারের রাস্তার পাশে বিক্রি করতেন। এই সবজি বিক্রির সামান্য আয় দিয়েই চলত দুই মেয়ের পড়ালেখা ও সংসারের খরচ।

আমানতবাগের শান্তনাদের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পাড়া-প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষের ভিড়। স্বামী বোধিপ্রিয় নির্বাক। প্লাস্টিকের একটি চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন তিনি। স্ত্রী ও পরিবারের কথা বলতে গিয়ে ডুকে উঠছেন কান্নায়, যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। পঙ্গু মানুষটির একমাত্র ভরসা ছিলেন তাঁর স্ত্রী শান্তনা।
দুর্ঘটনার পর বাবা পা হারিয়ে আর কোনো কাজ করতে পারেন না।” ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে মায়ের সব কষ্ট ঘুচিয়ে দেবেন—এমনটাই ছিল পৃথিলার স্বপ্ন।
স্ত্রীর এই আকস্মিক মৃত্যুতে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোধিপ্রিয় বলেন, “সরকার বা হৃদয়বান কেউ যদি আমাকে একটি ‘বিকাশ-নগদ’-এর এজেন্ট ব্যবসার ব্যবস্থা করে দেন, তবে এক জায়গায় বসেই অন্তত এই এতিম মেয়ে দুটোকে নিয়ে বেঁচে থাকার প্রেরণা পাবো।”
রোববার ভোরে কুতুকছড়ির হাটে যাওয়ার পথে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প এলাকায় তাঁদের বহনকারী পিকআপ ভ্যানটি উল্টে শান্তনাসহ চারজন মারা যান। নিহত চারজনের মধ্যে তিনজনই পেশায় সবজি বিক্রেতা ছিলেন। তারা সবাই কল্যাণপুরে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের পাশে বসে সবজি বিক্রি করতেন।
এদিকে এ ঘটনার পর তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে কল্যাণপুর কলেজ গেট ও বনরূপা সড়ক এলাকার সবজি বিক্রেতাদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সহকর্মী সবজি বিক্রেতা শিমুলিকা চাকমা বলেন, “গতকাল সন্ধ্যায় সবজি বিক্রি শেষে শান্তনা আমাকে বলে যান, ’নাউরি জাঙর লোই’। আজ সকালে শুনি তাঁর চলে যাওয়ার এমন মর্মান্তিক খবর। খুব খারাপ লাগছে, এমন আকস্মিক বিদায় কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।”
কল্যাণপুর মুখের বিপরীত দিকে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের সামনে ত্রিপলের ছাউনির নিচে বসে আছেন সবজি বিক্রেতা হেমলতা চাকমা (৫৮) ও সিদোল (ঙাপ্পি) বিক্রেতা ধর্মধন চাকমা (৬০)। শান্তনাদের দেখতে হাসপাতাল থেকে ফিরে তাঁরা আবার নিজেদের দোকানে বসেছেন। তাঁরা জানান, নিহতরা সবাই কুতুকছড়ি, ঘিলাছড়িসহ বিভিন্ন বাজার থেকে ভোরে পাইকারি দরে সবজি এনে এই শহরে বিক্রি করতেন।
সবজি বিক্রেতা হেমলতা চাকমা বলেন, নিহত মেঘরানী প্রায়ই তাঁকে বলতেন, “শহরে যদি নিজের একটি ঘর থাকত, তবে আমি এই ব্যবসা আর করতাম না।”
মেঘরানীর স্বামীও একই ব্যবসা করেন। তাঁদের একমাত্র ছেলে অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ার পাশাপাশি ব্যবসার কাজে মা-বাবাকে সহযোগিতা করতেন।
এর আগে সকালে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মর্গ থেকে একে একে লাশগুলো যার যার ঠিকানায় পাঠানোর জন্য গাড়িতে তোলা হচ্ছিল। সেখানে উপস্থিত আত্মীয়স্বজনদের চোখেমুখে ছিল স্বজন হারানোর গভীর শূন্যতা।




