পার্বত্য চট্টগ্রামের নিজস্ব সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং বিশেষ করে স্থানীয় নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে একটি ‘সাংস্কৃতিক ও নারীবান্ধব’ পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে। রোববার উইমেন রিসোর্স নেটওয়ার্ক এর আয়োজনে রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং নারী অধিকার কর্মীরা এই দাবি জানান।
সভায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে পর্যটনের প্রসার ও পর্যটকদের আচরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। প্রবন্ধে অভিযোগ করা হয়, অনেক পর্যটক স্থানীয়দের পবিত্র স্থান, জুম ভূমি এবং পাড়ায় জোরপূর্বক প্রবেশ করে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুভুতিতে আঘাত করছেন, উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে বা মাইক ব্যবহার করে পরিবেশ নষ্ট করছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো নারীদের নিরাপত্তা; স্থানীয় নারীদের জুম ক্ষেতে কাজ করার সময় বা নদীতে গোসল ও পানি সংগ্রহের সময় অনুমতি ছাড়াই ছবি ও ভিডিও তোলা হচ্ছে, যা তাদের মানসিকভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলছে। এমনকি পর্যটন এলাকায় নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকি এবং যৌন ব্যবসার প্রলোভন তৈরির আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়। স্থানীয়দের মতামত উপেক্ষা করে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমিতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে, প্রাকৃতিক বন উজাড় এবং পাহাড়ের আঞ্চলিক নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে, যার ফলে নারী, পরিবেশ ও সামাজিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পর্যটন ব্যবসার সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না, বরং আয় বৈষম্য বাড়ছে এবং তারা সনাতন পেশা হারাচ্ছেন।
সভায় জাতীয় পর্যটন নীতি ২০২৪ এবং নিরাপদ ও টেকসই পর্যটন আচরণবিধি ২০২৩-এর কিছু ইতিবাচক ধারার প্রশংসা করা হলেও সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ‘নারীবান্ধব পর্যটন’-এর সংজ্ঞা জাতীয় নীতিতে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, যেখানে শুধুমাত্র নারী পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে, অথচ স্থানীয় পাহাড়ি নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটন খাতের টেকসই উন্নয়নে এবং স্থানীয়দের স্বার্থ রক্ষায় পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মানজনক অংশগ্রহণ এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় তাদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। পার্বত্য এলাকার পর্যটন ব্যবস্থা পার্বত্য জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতে হবে এবং স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। পর্যটন এলাকায় নারীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাথে সাথে স্থানীয়দের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের প্রতি পর্যটকদের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো নতুন পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের আগে স্থানীয়দের সম্মতি ও আলোচনা অপরিহার্য। এছাড়া স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে পর্যটকদের জন্য একটি মৌলিক আচরণবিধি তৈরি এবং তা কার্যকরভাবে প্রচার করার আহ্বান জানানো হয়, বিশেষ করে ফসল সংগ্রহ, বন্যপ্রাণী শিকার এবং অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা সংক্রান্ত স্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান এবং প্রধান আলোচক ছিলেন চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। এছাড়াও রাঙামাটি টুরিস্ট পুলিশ সুপার মো খাইরুল আলম, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান সহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অ্যাডভোকেট সুস্মিতা চাকমা। আলোচনা সভায় পাহাড়ে পর্যটনের নানান সংকট নিয়ে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন হেডম্যান জনপ্রতিনিধি পর্যটন ব্যবসায়ী উন্নয়ন কর্মীসহ পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।




