রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
মূলপাতাঅপরাধপ্রকল্পের ভেতরেই 'লুটেরা' সিন্ডিকেট: পাহাড়ে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে কোটি কোটি টাকার হরিলুট

প্রকল্পের ভেতরেই ‘লুটেরা’ সিন্ডিকেট: পাহাড়ে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে কোটি কোটি টাকার হরিলুট

পার্বত্য অঞ্চলের অবহেলিত ও দরিদ্র মানুষের ভাগ্যবদল, আমিষের চাহিদা পূরণ এবং ক্ষুদ্র খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে “৩টি পার্বত্য জেলায় সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প” নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদি এই মেগা প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার ২৬টি উপজেলার ১২৮টি ইউনিয়নে এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রকল্প বিবরণী অনুযায়ী, মোট খরচের মধ্যে কর্মশালায় ৪ লক্ষ ৭৬ হাজার, ভিডিও চিত্র নির্মাণে ৮ লক্ষ, আউটসোর্সিং নিয়োগে ৩৪ লক্ষ ৬ হাজার, অনিয়মিত শ্রমিক নিয়োগে ২৭ লক্ষ, পরিবহন ব্যয়ে ২ লক্ষ, প্রশিক্ষণ ব্যয়ে ২ কোটি ৫৬ লক্ষ ৭ হাজার, মেডিসিন ও ভ্যাকসিনে ২ কোটি ৫৫ লক্ষ ৭৮ হাজার, প্রাণী খাদ্যে ২ কোটি ৮ লক্ষ ৫ হাজার, মুদ্রণ ও প্রকাশনায় ১৯ লক্ষ, বেইস লাইন সার্ভেতে ১২ লক্ষ, প্রকল্প মূল্যায়নে ৭ লক্ষ, পিডি অফিস রিনোভেশনে ৪ লক্ষ, পোল্ট্রি খামার মেরামতে ২০ লক্ষ, প্যাকেজ অনুদানে ৩১ কোটি ১১ লক্ষ ৭৬ হাজার, যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৫ লক্ষ ৫৫ হাজার, আইপিএস ও এয়ার কুলারে ৪ লক্ষ, ফটোকপি মেশিনে ২ লক্ষ ৫০ হাজার, আসবাবপত্রে ৬ লক্ষ ৫৯ হাজার, ইনকিউবেটর মেশিনে ৩ কোটি ২০ লক্ষ এবং রাঙামাটি পিগফার্মের সংস্কার কার্যক্রমে ২ কোটি ২৭ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা ব্যয় ধার্য করা হয়েছে।
কাগজে-কলমে লক্ষ্য মহৎ হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাহাড়ি জনপদের ভূ-প্রকৃতি ও প্রথাগত প্রাণিপালনের রীতি উপেক্ষা করে ঢাকায় বসে তৈরি করা অবাস্তব পরিকল্পনার কারণে সরকারের কোটি কোটি টাকার উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।
পরিত্যক্ত ঘর ও মাঠ পর্যায়ের দুর্নীতির থলে
প্রথম ধাপে প্রতি পরিবারকে ৩০টি করে ফাওমি মুরগি (২৫৬০ পরিবার), ২টি করে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল (২৫৬০ পরিবার), ২টি করে ভেড়ি (৩৪৫৬ পরিবার) ও ২টি করে শূকর (৩২০০ পরিবার) এবং তা রাখার জন্য একই মাপে (৪x৫ ফুট) ১১ হাজার ৭৭৬টি মাচাং ঘর দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্ধেকের বেশি ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাণিসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “মাচাং ঘর তৈরিতে ১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও এগুলো ভৌগোলিক বাস্তবতায় উপযুক্ত নয়। উপাদান দিলে খামারিরা নিজেরাই ঘর বানাতে পারতেন। ফলে সরকারি টাকা নষ্ট হয়েছে।” ঠিকাদার মোহাম্মদ করিম জানান, প্রতি ঘরে ৮ হাজার টাকা ব্যয় করে তিনি তা সরবরাহ করছেন।
সুফলভোগী কুতুকছড়ি আবাসিক এলাকার শান্তি রাম চাকমা বলেন আমাদের একদিনের ট্রেনিং দেয়া হয়। ৮শ টাকা ও এক পেকেট ভাত পেয়েছি। এরপর দুটি শূকর ছানা একটি মাচাং ঘর পেয়েছি। তিনি বলেন, ঘর তৈরিতে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে।
আবাসিক এলাকার আরেক সুফলভোগী ফুল রতন চাকমা বলেন, মুরগি ও শূকরের জন্য একই ঘর দেওয়া হয়েছে। শূকর এতে থাকে না, কয়েকদিন পর এমনিতেই ভেঙে পড়বে।
আসামবস্তি রোয়াজা করাত কলের ব্যবস্থাপক শান্তি চাকমা বলেন আমার করাত কল থেকে সস্তা কাঠের তক্তা দিয়ে ঘরগুলো বানায়। কারিগররা কেউ পরিচিত নয়।
রাঙাপানী গ্রামের জয়া চাকমা (২৪) বলেন, “রাস্তায় দুটো মাচাং ঘর পরিত্যক্ত দেখে মালিকের কাছ থেকে একটি ঘর ৫০০ টাকা দিয়ে কিনে এনেছি। এটি প্রকল্পের ঘর, তা জানতাম না। আমি শূকর মুরগি ছাগল কোন কিছুই পাইনি।


সদর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন খামারি লুৎফুন নাহার জানান, ৩০টি মুরগির জন্য দেওয়া ঘরটিতে জায়গা না হওয়ায় ১৪টি মুরগি মারা গেছে এবং তিনি নিজ খরচে একটি নতুন ঘর বানিয়েছেন।

দেয়া হয়নি প্রাণী খাদ্য দায়ছাড়া কর্মশালা
প্রকল্পে প্রাণী খাদ্য বাবদ ২ কোটি ৮ লক্ষ ৫ হাজার টাকা বরাদ্ধ রাখা হলেও সুবিধাভোগীরা বলেছেন তাদের কোন প্রাণী খাদ্য দেওয়া হয়নি।
সুবিধাভোগী ফুল রতন চাকমা বলেন, কুতুকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে আধাবেলা কর্মশালা করা হয়েছে। সেদিন এক প্যাকেট ভাত ও ৮শ টাকা দেয়া হয়। তবে শূকর দেওয়ার আগে ও পরে কোন খাদ্য দেয়া হয়নি। একই কথা বলেন, মুরগী খামারি লুৎফুন নাহার। তিনি বলেন তাকে কোন মুরগী খাবার দেয়া হয়নি। কোন ঔষধও দেয়া হয়নি।
ভৌগোলিক বৈষম্য ও চাতুরতা
হ্রদবেষ্টিত রাঙামাটিতে হাঁস পালনের প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও এই প্রকল্প থেকে হাঁস প্রজনন খামারকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পার্বত্য অঞ্চলের নাম ভাঙিয়ে ইনকিউবেটর ও যন্ত্রপাতির জন্য বরাদ্দকৃত ৩ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে চট্টগ্রামের বিভাগীয় খামারের জন্য।
রাঙামাটি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ডা. শ্রুতি চাকমা জানান, এ বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না, কেবল ওপরের নির্দেশ পালন করছেন।
হুমকির মুখে প্রজনন কেন্দ্র
রাঙামাটির সংরক্ষিত সরকারি হাঁস প্রজনন কেন্দ্রের ভেতরে হাঁসের খাদ্য গুদামে প্রকল্পের সিমেন্ট রাখা হয়েছে। এর পরপরই খামারের ডিমের উৎপাদন কমে গেছে বলেন খামারের এক কর্মচারী।
লোকবল সংকট ও দাপ্তরিক কাজ ব্যাহত
প্রকল্পের নিজস্ব লোকবল না থাকায় অফিশিয়াল কাজ ফেলে উপজেলা কর্মকর্তাদের এসব তদারকি করতে হচ্ছে।
অথচ আউটসোর্সিং ও অনিয়মিত শ্রমিক নিয়োগে ৬১ লক্ষ টাকার বেশি বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্পের রাঙামাটি দায়িত্ব থাকা প্রাণী সম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কল্পনা চাকমা বলেন, তিন জেলায় আমাদের ৬ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলা-উপজেলার স্টাফদের নিয়ে কাজ চালাচ্ছি।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রীমা মহাজন বলেন, “আমাদের লোকবল সংকটের মধ্যে ভৌগোলিক বাস্তবতায় প্রতি ইউনিয়নে গিয়ে তাদের কাজ দেখাশুনা করা আমাদের জন্য কঠিন একটি বিষয়। এগুলো দেখাশুনা করার জন্য প্রকল্পের অন্তত প্রতি ইউনিয়নে একজন করে লোক দেওয়া দরকার ছিল।
সংস্কারহীন শূকর খামার
রাঙামাটি পিগফার্ম সংস্কারের নামে ২ কোটি ২৭ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কাজই শুরু হয়নি। পিগফার্মের ব্যবস্থাপক ডা. লেলিন দে জানান, কোনো সংস্কার না হলেও তাদের খামার থেকে ইতোমধ্যে প্রকল্পের জন্য প্রায় ৮০টি শূকরের বাচ্চা সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা অন্ধকারে
প্রাণিসম্পদ বিভাগ জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তরিত হলেও পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য প্রতুল চন্দ্র দেওয়ান বলেন, সুনির্দিষ্ট ব্যয় বা ঠিকাদার নিয়োগ সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, বিভাগটি তাঁর কাছে ন্যস্ত না থাকায় তিনি এ বিষয়ে অবগত নন।
জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ ওমর ফারুক জনস্বার্থে সব নথিপত্র ও খরচের হিসাব প্রকাশের দাবি জানান।
জেলা প্রাণী সম্পদক কর্মকর্তা ডা. আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েম বলেন, বিষয়টি ঢাকা থেকে দেখাশুনা করা হয়। স্থানীয় জেলা পরিষদ এটা জানার কথা। তাদের স্বাক্ষর ছাড়া তো কাজ হয় না।
এসব অনিয়মের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রকল্প পরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন এগুলো সাংবাদিকের জানার বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ প্রাণিসম্পদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি আমরা বুঝব, সাধারণ মানুষের এটি বোঝার দরকার নেই।

 

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Google search engine
Google search engine
Google search engine

Recent Comments