রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় সুকৌশলে জমির ‘চৌহদ্দি’ (সীমানা) পরিবর্তন করে সরকারি খাসজমি আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে মিলন কান্তি দাশের বিরুদ্ধে। জালিয়াতির মাধ্যমে সীমানা বাড়িয়ে উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে আদালতে মামলা করে তিনি পরাস্ত হলেও, রায়ের আগে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সরকারি প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ বাগিয়ে নিয়েছেন।
নথিপত্র অনুযায়ী, নানিয়ারচরের মাইসছড়ি মৌজার হোল্ডিং নং- আর-১১০/১৮-এর মূল মালিক টেন্ডুলী চাকমা থেকে ০.২০ একর জমি ক্রয় করেন মিলন। কিন্তু বিক্রেতা তাকে জায়গা বুঝিয়ে দেননি। পরে আদালতে মামলা করে ২০১৭ সালে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে নামজারি করার সময় চাতুর্যের আশ্রয় নেন তিনি। মূল নথিতে উত্তর দিকে কেবল ‘কিচিং’ উল্লেখ থাকলেও, মিলন সেখানে ‘সরকারি ডরমেটরি’ এবং পূর্বে ‘মাইসছড়ি ছড়া ও কৃষিজমি’ যুক্ত করে দেন। এই বাড়তি চৌহদ্দি অন্তর্ভুক্ত করেই তিনি সরকারি কর্মচারীদের আবাসনটি নিজের দাবি করতে শুরু করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কিচিং ঘেঁষেই টেন্ডুলী চাকমা থেকে ক্রয়কৃত মধুসূদন চাকমার জমি। মধুসূদন বলেন, “টেন্ডুলী চাকমার দেড় একর জমি ছিল। সেখান থেকে আমি সচেতনভাবে উত্তর দিকে সীমানার শেষ প্রান্ত থেকে জমি মেপে নিয়েছি। উত্তর দিকে আমার পরে আর টেন্ডুলীর জমি নেই। মিলন আমার পরে জমি কিনেছে, কিন্তু বিক্রেতার কাছ থেকে তো জমি বুঝিয়ে নেয়নি! এখন সে যখন-তখন অন্যের জমি নিজের বলে দাবি করছে।” মধুসূদনের দক্ষিণ অংশের জমির মালিক বিমল দাশও জানান, মিলন তার সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে হেরে গেছেন।
৪১ নং মাইসছড়ি মৌজার হেডম্যান প্রতিনিধি ও গ্রাম কার্বারী শান্তি রঞ্জন চাকমা বলেন, “মিলন কান্তি সীমানা বাড়িয়ে সমস্যা সৃষ্টি করেছে। তার দাবিকৃত চৌহদ্দির সাথে মূল নথির মিল নেই। একাধিক সালিশেও প্রমাণিত হয়েছে মিলনের চৌহদ্দি ঠিক নাই। এখন সে কীভাবে সরকারি ক্ষতিপূরণ পেল, তা সংশ্লিষ্টরাই ভালো জানবেন।”
এই খাসজমিটি নিজের দাবি করে মিলন কান্তি আদালতে দেওয়ানি মামলা (সিভিল সুট নং- ৭৩/২০২৩) দায়ের করেন। গত ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি পার্বত্য জেলার যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মনীষা মহাজন মামলাটি খারিজ করে দেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, বাদী মিলন কান্তি নালিশি জমিতে স্বত্ব প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন এবং বিবাদীরা ২০১৪ সাল থেকে সেখানে বৈধভাবে বসবাস করছেন। মিলন নিজের মনমতো সীমানা বাড়িয়েছেন, যা প্রকৃত নথির সাথে মিলে না।
আদালতে মিলনের দাবি অবৈধ প্রমাণিত হলেও, ২০১৯ সালে “বগাছড়ি-নানিয়ারচর-লংগদু সড়ক” নির্মাণ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। অ্যাওয়ার্ড শিট অনুযায়ী, ওই হোল্ডিংয়ের মূল ২ শতক জমি হুকুমদখল বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে তাকে ৩২,৭২,৪০০ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
নানিয়ারচর উপজেলা সরকারি চাকুরিজীবী সমবায় সমিতি লিঃ-এর সম্পাদক তাপস দেওয়ান বলেন, “মিলন কান্তি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে হেরেছে। সে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে খাস জমি নিজের দেখিয়ে সরকারি ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেছে এবং আমাদের হয়রানি করেছে। এখন আবার জজ আদালতে আপিল করে আমাদের অজান্তেই আমাকে তার সাথে বাদী করেছে।”
সনাক সভাপতি বাঞ্চিতা চাকমা বলেন, “আদালত নিশ্চিত করেছে জায়গাটি মিলনের নয়। সরকারি টাকা আত্মসাতের জন্য এই টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হবে এবং জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
অভিযোগ অস্বীকার করে মিলন কান্তি দাশ বলেন, “আমি চৌহদ্দি পরিবর্তন করিনি, এটি জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে করা হয়েছে। কোনো জালিয়াতি করিনি। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছি।”
নানিয়ারচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাপ্পী চাকমা বলেন, “মিলন কান্তির মামলার কারণে হয়তো ছোট এই বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। তবে ঘটনা আরও বড়। নানিয়াচর সেতু এপ্রোচ রোড সম্প্রসারণ প্রকল্পে একই সীমানা দেখিয়ে একাধিক ব্যক্তি কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেছে। এটা কীভাবে সম্ভব হলো? এখানে যে দুর্নীতি হয়েছে সেটা সত্য। তদন্ত করলেই সব বেরিয়ে আসবে।”
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, মিলন কান্তি ক্ষতিপুরণ উদ্ধার বিষয়ে আদালত নির্দেশনা দিলে প্রশাসন কাজ করবে। সে টাকা উদ্ধার করা যাবে।
রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুহাম্মদ ইমরানুল হক ভূঁইয়া বলেন, “বিষয়টি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, সেহেতু আদালত যা নির্দেশনা দেয় আমরা তা মেনে চলব।”




