রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৬
মূলপাতাঅর্থনীতিনিভে গেল সংসারের একমাত্র প্রদীপ: শান্তনা চাকমার মর্মান্তিক মৃত্যু

নিভে গেল সংসারের একমাত্র প্রদীপ: শান্তনা চাকমার মর্মান্তিক মৃত্যু

পাঁচ বছর আগের এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী বোধিপ্রিয় চাকমা একটি পা হারান। স্বামীর আয়ে অক্ষম হয়ে পড়ার পর সংসারের সম্পূর্ণ ভার কাঁধে পড়ে স্ত্রী শান্তনা চাকমার। দুই কন্যাকে নিয়ে রাঙামাটি শহরের আমানতবাগ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে পুরো সংসারের ঘানি একাই টানছিলেন তিনি।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে দূর পাহাড়ি পথে ছুটতেন কাঁচাবাজারের সন্ধানে। সেখান থেকে শাক সবজি সংগ্রহ করে রাঙামাটির কল্যাণপুর ও বনরূপা বাজারের রাস্তার পাশে বিক্রি করতেন। এই সবজি বিক্রির সামান্য আয় দিয়েই চলত দুই মেয়ের পড়ালেখা ও সংসারের খরচ।
শান্তনা চাকমার বড় মেয়ে পৃথিলা চাকমা ভেদভেদী পৌর উচ্চবিদ্যালয় থেকে সদ্য এসএসসি পাস করেছে। ছোট মেয়ে আকৃতা চাকমা আমানতবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।
আমানতবাগের শান্তনাদের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পাড়া-প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষের ভিড়। স্বামী বোধিপ্রিয় নির্বাক। প্লাস্টিকের একটি চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন তিনি। স্ত্রী ও পরিবারের কথা বলতে গিয়ে ডুকে উঠছেন কান্নায়, যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।
পঙ্গু মানুষটির একমাত্র ভরসা ছিলেন তাঁর স্ত্রী শান্তনা। মায়ের মরদেহের পাশে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বড় মেয়ে পৃথিলা চাকমা বলেন, “আমার পড়াশোনা কীভাবে চলবে, সেই চিন্তায় পড়ে গেছি। আমাদের পরিবারে মা-ই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন।
দুর্ঘটনার পর বাবা পা হারিয়ে আর কোনো কাজ করতে পারেন না।” ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে মায়ের সব কষ্ট ঘুচিয়ে দেবেন—এমনটাই ছিল পৃথিলার স্বপ্ন। স্ত্রীর এই আকস্মিক মৃত্যুতে নিজের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ভবিষ্যতের দিকে তাকালে কেবল অন্ধকার দেখছি। সরকার বা হৃদয়বান কেউ যদি আমাদের একটি মুদি দোকান করে দিত, তবে অন্তত এতিম মেয়ে দুটোকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারতাম।”
রোববার ভোরে কুতুকছড়ির হাটে যাওয়ার পথে মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্প এলাকায় তাঁদের বহনকারী পিকআপ ভ্যানটি উল্টে শান্তনাসহ চারজন মারা যান। নিহত সবাই পেশায় সবজি বিক্রেতা ছিলেন।
নিহতরা সবাই কল্যাণপুরে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের পাশে বসে সবজি বিক্রি করতেন।
এদিকে এ ঘটনার পর তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে কল্যাণপুর কলেজ গেট ও বনরূপা সড়ক এলাকার সবজি বিক্রেতাদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সহকর্মী সবজি বিক্রেতা শিমুলিকা চাকমা বলেন, “গতকাল সন্ধ্যায় সবজি বিক্রি শেষে আমাকে বলে যান, ’নাউরি জাঙর লোই’। আজ সকালে শুনি তাঁর চলে যাওয়ার এমন মর্মান্তিক খবর। খুব খারাপ লাগছে, এমন আকস্মিক বিদায় কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।”
কল্যাণপুর মুখের বিপরীত দিকে প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের সামনে ত্রিপলের ছাউনির নিচে বসে আছেন সবজি বিক্রেতা হেমলতা চাকমা (৫৮) ও সিদোল (ঙাপ্পি) বিক্রেতা ধর্মধন চাকমা (৬০)। শান্তনাদের দেখতে হাসপাতাল থেকে ফিরে তাঁরা আবার নিজেদের দোকানে বসেছেন।
তাঁরা জানান, নিহতরা সবাই কুতুকছড়ি, ঘিলাছড়িসহ বিভিন্ন বাজার থেকে ভোরে পাইকারি দরে সবজি এনে এই শহরে বিক্রি করতেন। সবজি বিক্রেতা হেমলতা চাকমা বলেন, নিহত মেঘরানী প্রায়ই তাঁকে বলতেন, “শহরে যদি নিজের একটি ঘর থাকত, তবে আমি এই ব্যবসা আর করতাম না।”
মেঘরানীর স্বামীও একই ব্যবসা করেন। তাঁদের একমাত্র ছেলে অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ার পাশাপাশি ব্যবসার কাজে মা-বাবাকে সহযোগিতা করতেন।
এর আগে সকালে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মর্গ থেকে একে একে লাশগুলো যার যার ঠিকানায় পাঠানোর জন্য গাড়িতে তোলা হচ্ছিল। সেখানে উপস্থিত আত্মীয়স্বজনদের চোখেমুখে ছিল স্বজন হারানোর গভীর শূন্যতা।
প্রসঙ্গত রাঙামাটি রবিবার ছয় টার দিকে রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের মানিকছড়ি আর্মি ক্যাম্পের সামনে রাঙামাটি চট্টগ্রাম মহাসড়কে পিকআপ উল্টে ৪ জনের মৃত্য হয়। আইনী প্রক্রিয়া শেষে পুলিশ লাশগুলো পরিবারদের কাছে হস্তান্তর করেছে।
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

Most Popular

Google search engine
Google search engine
Google search engine

Recent Comments