টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবান জেলার বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ধস ও পানিতে ভেসে গিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে ৫ জন এবং পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
গেল শুক্রবার রাতভর হওয়া মুষলধারে বৃষ্টিতে জেলার নদ-নদী ও ঝিরির পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
বান্দরবান-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একাধিক স্থানে পানি উঠে যাওয়ায় সারাদেশের সঙ্গে জেলার সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের কারণে মাটি ও গাছ উপড়ে সড়কের ওপর পড়ে থাকায় রুমা, থানচি, আলীকদম, রোয়াংছড়ি, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়িসহ ৬টি উপজেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের ব্রিজঘাট এলাকায় একটি সেতু ভেঙে পড়ায় ওই রুটেও সব ধরনের যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বন্যার পানিতে জেলা শহরের নিম্নাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক, যার ফলে স্থানীয়দের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে এখন বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় খাদ্য, জরুরি ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি এবং ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢাল থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও এনজিও কর্মীরাও এই দুর্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন।
পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই জানিয়েছেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি এবং জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মো: সানিউল ফেরদৌস জানান, প্রশাসন চব্বিশ ঘণ্টা দুর্গতদের খোঁজখবর রাখছে এবং শুরু থেকেই দিন-রাতের খাবারের ব্যবস্থা করছে। অন্যদিকে পৌর প্রশাসক এস এম মঞ্জুরুল হক জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় পৌরসভা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বান্দরবান আসনের সংসদ সদস্য সাচিংপ্রু জেরি জানান, এবারের আকস্মিক বন্যা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি না থাকলেও তারা সাধ্যমতো কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত ত্রাণ এবং ওষুধ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানো হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংসদ সদস্য ও যুবদলের হাতেগোনা কিছু নেতাকর্মী ছাড়া বিএনপির অন্য কোনো স্তরের নেতাদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি, যা নিয়ে বান্দরবানের বন্যা প্লাবিত মানুষের মনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে না এলে এবং ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক মাইকিং করে অতি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান না করার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।




