রাঙামাটির বালুখালি মরিশ্যাবিলের একসময়ের অনাবাদী পাহাড়ি জমি এখন ভরে উঠেছে আম, মাল্টা, কলা, পেঁপে আর কমলার সবুজ হাসিতে।
মরিশ্যাবিল এলাকায় এখন বইছে এক নীরব কৃষি বিপ্লবের হাওয়া। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে পরিচালিত ‘পার্টনার’ প্রকল্প এবং স্থানীয় কৃষি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে পাহাড়ি কৃষকরা এখন রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ খাদ্য ও ফল উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য পাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পাহাড়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে পার্টনার প্রকল্প। বিশেষ করে ক্ষতিকর কীটনাশক বর্জন করে প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমন (আইপিএম পদ্ধতি) এবং জমিতে যথাযথ পরিমাণে জৈব ও রাসায়নিক সারের সুষম ব্যবহারে কৃষকদের সচেতন ও দক্ষ করে তোলা হচ্ছে।
পার্টনার প্রকল্পের এই আধুনিক ছোঁয়ায় মরিশ্যাবিল এলাকার স্থানীয় বাগানীরা এখন বাণিজ্যিকভাবে মিশ্র ফল চাষে দারুণ সফল। আম, মাল্টা, কলা, পেঁপে ও কমলার মতো উচ্চমূল্যের ফল চাষ করে ভাগ্য বদলাচ্ছেন স্থানীয় জুমচাষী ও বাগানীরা। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ ও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন পার্টনার প্রকল্পের কর্মকর্তা ও রাঙামাটি সদর কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা।

মরিশ্যাবিল ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা দেবাশীষ দেওয়ান বলেন, “পার্টনার প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের কারণে মরিশ্যা বিলে আমরা একটি আদর্শ মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। বিশেষ করে আম বাগানে ক্ষতিকর বিষ বা কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে আমরা কৃষকদের মাঝে ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ (ফল ঢেকে রাখার বিশেষ ব্যাগ) প্রযুক্তি বিতরণ করেছি। এর ফলে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত ও রপ্তানিযোগ্য উন্নত মানের আম উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে।”
কৃষকদের স্যার স্প্রে মেশিন পোকা দমন ছত্রাক দমনের ঔষধ দেয়া হচ্ছে। এগুলো প্রয়োগে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের পতিত পাহাড়ি জমিতে এই আধুনিক চাষাবাদে অভাবনীয় রূপান্তর এনেছেন স্থানীয় সফল বাগানী চিকু চাকমা। নিজের অনুভূতি ও কৃষি বিভাগের সহায়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন:
“কৃষি বিভাগ আর পার্টনার প্রকল্পের কর্মকর্তারা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। আগে আমরা সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করতাম, রোগ-বালাই হলে বুঝতাম না কী করতে হবে। কিন্তু এখন স্যারেরা সবসময় মাঠে এসে আমাদের পাশে দাঁড়ান। কোন সারের পর কোন সার দিতে হবে, কীভাবে বিষ ছাড়া প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা তাড়াতে হবে—সব হাতেনাতে শিখিয়ে দিয়েছেন। আমাদের আম বাগানগুলোর জন্য যখন ফ্রুট ব্যাগ দেওয়া হলো, প্রথম প্রথম কিছুটা নতুন লেগেছিল। কিন্তু এখন দেখছি এর কারণে একটা আমেও পোকা লাগেনি, রঙও হয়েছে চমৎকার। কোনো বিষ ছাড়াই আমরা এবার দারুণ ফলন পেয়েছি। আমাদের উৎপাদিত ফল এখন বিদেশে যাবে—এটা ভাবতেই বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। এই প্রকল্প আমাদের মতো পাহাড়ি কৃষকদের শুধু চাষবাসই শেখায়নি, আমাদের বাঁচার নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছে।”
রাঙামাটি সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ পারভীন বলেন রাঙামাটি সদর উপজেলার শুধু মরিশ্যা বিল নয়। উপজেলার ৭ ইউনিয়নে কৃষি বিভাগের সাথে পার্টনার কাজ করছে। এতে কৃষকরা বেশ উপকৃত হচ্ছেন। রাঙামাটি সদর এখন সবজি ও ফল উৎপাদনে বড় বাজার তৈরি করেছে। স্থানীয় চাহিদা পুরণ করে এগুলো সদরের বাইরে যাচ্ছে।




